একটু সময় নিয়ে পড়ো। তাড়াহুড়ো করে পড়লে কাজ হবে না।ছোটবেলায় একটা খেলা খেলতাম।
কেউ একজন একটা শব্দ বলতো। ধরো "গাছ"। তারপর সবাই চোখ বন্ধ করে গাছ ভাবতো, আর বলতো কী দেখেছে।
একজন বলতো বটগাছ। একজন বলতো নারকেল গাছ। একজন বলতো শীতের শুকনো গাছ। একজন বলতো আমাদের বাড়ির উঠোনের সেই পেয়ারা গাছ যেটা থেকে পড়ে হাত ভেঙেছিল।
একই শব্দ, চারটে আলাদা ছবি।
তখন মজার খেলা ছিল। এখন বুঝি এটা মজার না, এটা একটা বিশাল সমস্যা।
শব্দ কোনো বাক্স না।
মানে, আমরা ভাবি শব্দের ভেতরে মানে ভরা আছে, যেভাবে বাক্সের ভেতরে জিনিস থাকে। আমি বাক্স দিলাম, তুমি খুললে, ভেতরে জিনিস পেলে। শব্দও তাই: আমি শব্দ দিলাম, তুমি শুনলে, ভেতরে মানে পেলে।
কিন্তু শব্দ অমন কাজ করে না।
শব্দ হলো আঙুল। দেখানোর আঙুল। আমি যখন বলি "ভালোবাসা", আমি তোমাকে ভালোবাসা দিচ্ছি না। আমি একটা অভিজ্ঞতার দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছি, আর আশা করছি তুমিও ওই দিকে তাকাবে। আশা করছি তোমার মাথায় যে ছবি আসবে আর আমার মাথায় যে ছবি আছে সেটা মোটামুটি কাছাকাছি।
আশা করছি। গ্যারান্টি নেই।
এইখানে গোলমাল শুরু।
তুমি বললে "ভালোবাসা"। তোমার মাথায় আছে সেই রাত তিনটায় ফোনে কথা বলা, সেই চিঠি, সেই অপেক্ষা।
আমি শুনলাম "ভালোবাসা"। আমার মাথায় এলো দিদিমার হাতের ডালভাত, শীতের রাতে কম্বল গায়ে গল্প শোনা।
দুজনেই ভালোবাসা নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু দুটো একদম আলাদা জিনিস।
এখন যদি আমরা তর্ক শুরু করি ভালোবাসা আসলে কী, কে ঠিক কে ভুল, তাহলে সেই তর্ক শেষ হবে না। কারণ আমরা একই শব্দ ব্যবহার করছি কিন্তু একই জিনিসের দিকে তাকাচ্ছি না।
এবার "ঈশ্বর" শব্দটা ভাবো।
একজন বলছে ঈশ্বর। তার মাথায় আছে সেই গভীর রাতে একা বসে থাকতে থাকতে যে নীরবতা অনুভব করেছিল, যে বিশালতা, যে উপস্থিতি।
আরেকজন বলছে ঈশ্বর। তার মাথায় আছে মেঘের উপর বসে থাকা সাদা দাড়িওয়ালা এক বুড়ো যিনি সবার দিকে নজর রাখছেন।
আরেকজনের মাথায় মন্দিরের চূড়া, পুজোর থালা, ঘণ্টার শব্দ। আরেকজনের মাথায় মসজিদের গম্বুজ, আজানের সুর। আর একজনের মাথায় মহাবিশ্বের গাণিতিক সৌন্দর্য, ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স, গ্যালাক্সির ঘূর্ণন।
পাঁচজন, একটা শব্দ, পাঁচটা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।
এখন এই পাঁচজন যদি বসে তর্ক করে "ঈশ্বর আছে না নেই", তাহলে কী হবে বলো?
চেঁচামেচি হবে, রক্তচাপ বাড়বে, কেউ কারো কথা শুনবে না।
কারণ তারা ভাবছে একই জিনিস নিয়ে কথা বলছে। আসলে শব্দ এক, আঙুল পাঁচ দিকে।
জেন বৌদ্ধরা একটা সুন্দর কথা বলেছিল।
চাঁদের দিকে যে আঙুল দেখাচ্ছে, সেই আঙুল চাঁদ না।
তুমি যদি আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকো, চাঁদ কোনোদিন দেখা হবে না। আঙুল তো শুধু দেখাচ্ছে। আসল জিনিস আছে ওইখানে, আঙুল যেদিকে পয়েন্ট করছে সেদিকে।
এখন আমাদের অবস্থা কী জানো?
আমরা আঙুল নিয়ে মারামারি করছি।
তোমার আঙুল লম্বা না আমার আঙুল লম্বা। তোমার আঙুলে নখ পালিশ আছে আমার নেই। তোমার আঙুল ডানদিকে পয়েন্ট করছে আমার বাঁদিকে। তুমি তর্জনী দিয়ে দেখাচ্ছ আমি মধ্যমা দিয়ে।
চাঁদ? সেটা কী? আগে আঙুলের বিতর্ক মেটাও, তারপর দেখা যাবে।
বেশিরভাগ ধর্মীয় তর্ক এইরকম। বেশিরভাগ দার্শনিক তর্কও। এমনকি বেশিরভাগ রাজনৈতিক তর্কও।
লোকে একই শব্দ ব্যবহার করে ভাবে একই জিনিস নিয়ে কথা বলছে। আসলে প্রত্যেকের মাথায় আলাদা ছবি, প্রত্যেকের আঙুল আলাদা দিকে। তারপর চেঁচামেচি, মাথা ব্যথা, আর শেষে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছেড়ে দেওয়া।
তাহলে সমাধান কী?
প্রথম কাজ: থামা।
কেউ যখন একটা শব্দ বলে, ধরে নিও না তুমি বুঝে গেছ। জিজ্ঞেস করো, "তুমি এটা বলতে কী বোঝাচ্ছ?"
না, সিরিয়াসলি। এই একটা প্রশ্ন অনেক তর্ক থামাতে পারে।
"তুমি ঈশ্বর বলতে কী বোঝাচ্ছ?"
"তুমি ভালোবাসা বলতে কী বোঝাচ্ছ?"
"তুমি সাফল্য বলতে কী বোঝাচ্ছ?"
এই প্রশ্ন করলে প্রায়ই দেখবে সামনের মানুষ একটু থমকে যায়। কারণ সে নিজেও স্পষ্ট জানে না। সে শব্দটা ব্যবহার করছে কারণ শব্দটা শিখেছে, কিন্তু শব্দটা কোন দিকে দেখাচ্ছে সেটা কখনো ভাবেনি।
দ্বিতীয় কাজ: মনে রাখা যে শব্দ সীমিত।
কিছু অভিজ্ঞতা আছে যা শব্দে ধরা যায় না।
তুমি কাউকে ভালোবাসো। সেই অনুভূতিটা কী? বলো।
তুমি বলবে "অনেক ভালো লাগে।" কিন্তু সেটা তো পুরো জিনিস না। ওই অনুভূতির হাজার ভাগের এক ভাগও ওই শব্দে ধরে না।
তুমি সূর্যাস্ত দেখছ। অসাধারণ। বলতে চাও। কী বলবে? "সুন্দর।" ব্যস, ওটুকুই বলা গেল।
শব্দ এমনই। বড় অভিজ্ঞতা ছোট শব্দে আঁটে না।
তাই যখন কেউ বড় কিছু নিয়ে কথা বলে, ঈশ্বর, চেতনা, বাস্তবতা, মৃত্যু, এসব, মনে রেখো সে চেষ্টা করছে। শব্দ দিয়ে কিছু দেখানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু শব্দ পুরোটা ধরতে পারছে না।
সেই সীমাবদ্ধতার জন্য তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
তৃতীয় কাজ: আঙুলের বদলে চাঁদের দিকে তাকানো।
কেউ কিছু বলছে। শব্দগুলো শোনো, কিন্তু শব্দে আটকে থেকো না। ভাবো সে কী দেখাতে চাইছে।
অনেক সময় দেখবে শব্দ ভুল, কিন্তু দেখানোটা ঠিক।
অনেক সময় দেখবে তুমি যার সাথে তর্ক করছ সে আসলে একই চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে, শুধু অন্য আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।
তখন তর্কটা থামে, আর একটা অদ্ভুত জিনিস হয়। তুমি বুঝতে পারো তোমরা দুজন শত্রু না। দুজন দুটো জানালা দিয়ে একই ঘরে তাকাচ্ছিলে।
এই সিরিজে আমি অনেক শব্দ ব্যবহার করব।
ঈশ্বর, ধর্ম, চেতনা, বাস্তবতা, অস্তিত্ব, জ্ঞান।
এগুলো ভারী শব্দ। এগুলোর সাথে তোমার পুরনো সম্পর্ক আছে, হয়তো ভালো, হয়তো খারাপ। হয়তো বিশ্বাস, হয়তো অবিশ্বাস।
আমি তোমাকে বলছি সেসব একপাশে রাখো।
আমি যখন "ঈশ্বর" বলব, তোমার পুরনো ছবি মাথায় আনো না। দেখো আমি কোন দিকে দেখাচ্ছি। হয়তো আলাদা দিক, হয়তো তোমার জানা দিকই। কিন্তু আগে দেখো।
শব্দ নিয়ে তর্ক করো না। আগে দেখো আমি কী দেখাতে চাইছি।
আঙুল না। চাঁদ।
এই ছিল প্রথম চিঠি।
সোজা কথায়: শব্দ কিছু ধারণ করে না, শুধু দেখায়। দুজন একই শব্দ বলে আলাদা জিনিস দেখাতে পারে, আর বেশিরভাগ তর্ক এই কারণেই অর্থহীন। থামো, জিজ্ঞেস করো, দেখো আঙুল কোনদিকে যাচ্ছে।
পরের সপ্তাহে দ্বিতীয় চিঠি: মানচিত্র আর ভূখণ্ড। তোমার বিশ্বাস দেশ না, ম্যাপ।
The Glitch। চলছে।





